মোঃ আসাদুল ইসলাম, পাইকগাছা : - খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দক্ষিণ সোনাতনকাটি গ্রামের সোনাতনকাটি আলহেরা দাখিল মাদ্রাসা। একসময় এলাকার মানুষের স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এখন সেটি পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ভবনে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৫ বছর ধরে সেখানে নিয়মিত কোনো শিক্ষার্থী নেই, নেই পাঠদানও। অথচ কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটি সচল রয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ১৭ জন। প্রতি বছর সরকারি বইয়ের চাহিদা দেওয়া হচ্ছে, উপবৃত্তির সুবিধাও নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় শ্রেণিকক্ষগুলো গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর রাত হলে সেখানে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থানীয়রা ৩২ শতক জমি দান করেছিলেন, সেটি শিক্ষা কার্যক্রম হারিয়ে ফেলায় এখন সেই জমি ফেরত চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন দাতারা।ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলার দক্ষিণ সোনাতনকাটি গ্রামে ১৯৯৮ সালে স্থানীয়দের দান করা ৩২ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় সোনাতনকাটি আলহেরা দাখিল মাদ্রাসা। জমিদাতা রেখা বেগম, আনোয়ারা বেগম ও আকবর মোড়লসহ অন্যরা জানান, জমি দানের সময় শর্ত ছিল, যদি কোনোদিন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে জমি দাতা বা তাঁদের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
জমিদাতা আকবর মোড়লের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর মাদ্রাসাটি স্বাভাবিকভাবে চললেও পরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ধ্বংস হয়ে যায়। তাঁর দাবি, ২০১১ সালের পর থেকে কোনো শ্রেণিতে একজন শিক্ষার্থীও নেই। নেই নিয়মিত ক্লাস, নেই কার্যকর শিক্ষা উপকরণ। অথচ প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে সচল দেখিয়ে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০০১ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস মাদ্রাসাটির উদ্বোধন করেন এবং আর্থিক সহায়তাও দেন। কিন্তু পরবর্তীতে নানা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে সচল দেখিয়ে সরকারি সুবিধা ভোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছরের মতো চলতি বছরও শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি পাঠ্যবইয়ের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। সূত্র জানায়, এবার ২২৫ সেট বইয়ের চাহিদা দেওয়া হয়েছিল। পরে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণির জন্য ১৫ সেট এবং ষষ্ঠ থেকে দাখিল দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণির জন্য ১০ সেট বই বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে সেখানে কোনো শিক্ষার্থী নেই।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মীর নুরে আলম বলেন, এটি নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান। তাদের আরও বেশি বইয়ের চাহিদা ছিল, তবে কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপবৃত্তির সুবিধাও তারা পেয়ে আসছে। কীভাবে এসব সুবিধা পাচ্ছে, সেটি তদন্তের বিষয়।
সম্প্রতি বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে রাখা হয়েছে গোখাদ্য, কোথাও বাঁধা রয়েছে ছাগল। কোনো শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছিল না, এমনকি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর অফিস কক্ষও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে সুপারিন্টেন্ডেন্ট আজগার আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর স্ত্রী ও মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষিকা রাশিদা খাতুন বাড়ির উঠানে ধান শুকাচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, "আমি এইমাত্র ক্লাস নিয়ে এলাম।" তবে তখন মাদ্রাসার কোথাও কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রভাষক শফিয়ার রহমান বলেন, "এত বড় জালিয়াতি ও অনিয়ম আমি আর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখিনি। এখানে যা কিছু সরকারি বরাদ্দ আসে, সবই স্বামী-স্ত্রী মিলে আত্মসাৎ করেন বলে এলাকায় ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
দানকারী আকবর মোড়ল বলেন, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে জমি দিয়েছিলাম। এখন সেখানে বছরের পর বছর কোনো ছাত্র-ছাত্রী নেই। তাই শর্ত অনুযায়ী জমি ফেরত চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সুপারিন্টেন্ডেন্ট আজগার আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি একবার ফোন রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় শুনেই বলেন, "পরে কথা বলছি।" এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তাঁর বাড়িতে গিয়েও সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, "এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান পাইকগাছায় রয়েছে, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। লিখিত অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


0 Comments