- : রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল :-
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ভাষণটি "আই হ্যাভ এ প্ল্যান" নয়, বরং "আই হ্যাভ এ ড্রিম" নামে পরিচিত। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি এই ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যা কৃষ্ণাঙ্গদের সমান অধিকারের স্বপ্নকে তুলে ধরেছিল। ঠিক তেমনি ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে তারেক রহমান,তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশে ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংবর্ধনা পান এবং তার আগমন দেশের রাজনীতিতে,বিশেষ করে পরবর্তী নির্বাচনের সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় তারেক রহমান বলেছিলেন "আই হ্যাভ এ প্লান"। সুউচ্চ কন্ঠে তারেক রহমানের "আই হ্যাভ এ প্লান" শব্দ গুলো আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ওয়াশিংটন ডিসির লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সামনে জড়ো হওয়া আড়াই লাখের বেশি মানুষের সামনে দেওয়া ভাষণের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এক কথা সুপারসনিক গতিতে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। এই বক্তব্যর কারনে তাকে বাংলার লুথার কিং হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে "আই হ্যাভ এ প্লান" সম্পর্কে তারেক রহমান বিস্তারিত ব্যাখা না করলেও কিছু কথা তুলে ধরেছেন তাঁর নির্বাচনী জনসভায়। যেগুলোর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড,স্বাস্থ্য কার্ড সম্পর্কে আমরা ধারণা পেয়েছি। তার এই "আই হ্যাভ এ প্লানের" উপর আস্থা রেখেছেন বাংলাদেশের জনগন। যার ফল আমরা দেখতে পাই গত ১২ ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে।
১৭ ফেব্রুয়ারিতে ব্যাপক (২০৯) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে সমর্থ্য হয় বিএনপি। অবশ্য এই গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে পালকে যুক্ত হয়েছিল একটি অন্ধকার অধ্যায়। তারেক রহমানের "আই হ্যাভ এ প্লান" এবং এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের আগে দেড় যুগ কালে ঘটে যাওয়া ঘটনার সংক্ষিপ্ত ফ্লাস ব্যাক থেকে আমাদের একটু উকি দিয়ে ফিরতে হবে, তা নাহলে আমাদের প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে যাবে।
ফ্লাস ব্যাক:-
রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্যে দিয়ে সুদীর্ঘ দেড় যুগের স্বৈরশাসনের অবসানে হয় ২০২৪ সালে ৫ আগষ্ট। এসময়ের আগে শেখ হাসিনার শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিরোধী দল দমন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মত গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৩৫টি হত্যা, ৭টি মানবতাবিরোধী অপরাধ, এবং ৩টি অপহরণসহ মোট ১৫২টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। যেখানে সরকার পতনের আন্দোলনে গণহত্যার দায়ও রয়েছে।
খুন,গুম,বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পত্তি বাড়িঘর দখল সহ গণমাধ্যমের গলার টুটি চেপে ধরে নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়া সহ এহনো অপকর্ম নেই যা বিগত দেড় যুগ এদেশে সংঘটিত হয়নি।
শুধু মাত্র মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য মতে, আওয়ামী লীগের সরকারের অধীনে ২০০৯ হতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০২ জন মানুষ গুম হয়েছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সহ এইসব ঘটনার জন্য জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার রক্ষাকারী সংস্থা যেমন,হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরকারকে নিন্দা জানিয়েছে। এইসব ঘটনার অধিকাংশের জন্য বাংলাদেশের একটি আধা সামরিক বাহিনী র্যাবকে দায়ী করা হলেও, র্যাব এইসব অভিযোগ কখনও স্বীকার করেনি। ভুক্তভোগীরা পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেও আওয়ামী লীগ সরকার গুম হবার পেছনে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে।আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮২ জন গুম হয়। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই ছিল বিরোধী দলের নেতাকর্মী। গুম হওয়ার পরে, নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ৪৯ জন মারা গেছেন এবং অন্যরা নিখোঁজ রয়েছেন। বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪ আগে কমপক্ষে ২০ জন বিরোধী দলীয় নেতা কর্মীকে নিরাপত্তা বাহিনী সদস্যরা তুলে নেয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৮৯ জন লোক নিখোঁজ হয়েছে।
২০১৬ সালে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা সরকারকে তাদের প্রিয়জনের হদিস বের করে দিতে মায়ের ডাক নামে একটি মঞ্চ গঠন করে। বিএনপি-জমায়াতে ইসলামি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল লাগাতার আন্দোলন সংগ্রাম করে আসতে থাকলেও সরকারের দমন-পীড়নে আশানুরূপ ফল অর্জন করতে পারেনি। এভাবেই গণতন্ত্র হারিয়ে দেশটি যখন প্রায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তখনই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান অঙ্কুরে দানা বাঁধতে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারিকৃত পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে শুরু হয়, এই আন্দোলনে তৎকালীন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার চিরচেনা দমন-পীড়ন শুরু করলে এটি অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। এই গণঅভ্যুত্থানের কারণে ৫ই আগস্ট তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে এবং দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। অপরদিকে স্বৈরাচার পালিয়ে গেলে বাংলাদেশ সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়ে। যার একপর্যায়ে তিন দিন পরে ৮ই আগস্ট ড.মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তবর্তী কালীন সরকার গঠিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। অর্থাৎ, এই সময় পর্যন্ত তিনি প্রায় ১ বছর ৬ মাসের বেশি সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কাল হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিচিতি পায়। তারপরের সমসাময়িক ইতিহাসতো আমাদের সবার জানা।
বর্তমান:-
নানাঘাত প্রতিবাদ, সংঘাত পেরিয়ে অবশেষে ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আবারো গণতান্ত্রিক ধারার রেল লাইনে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। তবে তারেক রহমানের প্লান বাস্তবায়নে বাংলাদেশের জনগনের যে প্রত্যাশা সেগুলো উপর উল্লেখিত ঘটনার ভেতর থেকে অবশ্যই গ্রহণ করা আবশ্যক বলে আমি মনে করি। ফ্যামিলি কার্ড,কৃষক কার্ড,স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়া চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য জরুরী পদক্ষেপ যেমন জীবনের নিরাপত্তা প্রদান,গুম,খুন, চাঁদাবাজি,সন্ত্রাসী, মিথ্যা মামলা দায়ের, বিভিন্ন বাহিনীর হয়রানি,বিচার বহিঃ ভুত হত্যাকাণ্ড,অর্থ পাচার,দূর্নীতি বন্ধ সহ বিদেশীদের বাংলাদেশ উপর প্রভূত্ববাদের সকল ধরনের শিকড় উপড়ে ফেলা। দেশের অভ্যন্তরে পূর্ণ গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা। নিয়মানুসারে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বৈরাচারী কর্মকান্ডে জড়িতদের চিরস্থায়ী বর্জন ও ভবিষ্যতে স্বৈরাচার হওয়ার সকল পথ রুদ্ধ করার মধ্যে দিয়ে উন্নত বিশ্বের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার আহবান রেখে আমরা বলতে চাই আপনার আছে "আই হ্যাভ এ প্লান" আর আমাদের আছে "উই হ্যাভ এ ড্রিম"। আশাকরি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য পুত্র হিসেবে আপনি পারবেন। আপনাকে পারতেই হবে। আপনাকে "আই হ্যাভ এ প্লান" বাস্তবায়ন করতেই হবে। আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনার "আই হ্যাভ এ প্লান" ফেল করা মানে বিশ কোটি মানুষের "উই হ্যাভ এ ড্রিম" ফেল করা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Email:rabidchanchall@yahoo.com



0 Comments