পাইকগাছা প্রতিনিধি : - একদিকে চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা। দুই পরিচয়ের সমন্বয়ে পাইকগাছার রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ ডা. মো. আব্দুল মজিদ। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, কর্মসূচি পালন এবং সংগঠনকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেছেন বলে তাঁর দলীয় সহকর্মীরা জানান। নানা সময় মামলা ও হয়রানির পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি এমন দাবি স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পথ সবসময় সরল ছিল না। সময়ের সঙ্গে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে পাইকগাছা বিএনপিকে। এসবের মধ্যেই সংগঠনকে ধরে রাখার পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন ডা. মজিদ।
পাইকগাছা বিএনপির সাম্প্রতিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ডা. আব্দুল মজিদের উপস্থিতি নিয়মিত দেখা গেছে। ২০২৪ সালে দলীয় কর্মসূচিতে তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন। ২০২৫ সালে উপজেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও সাংগঠনিক সভা ও গণসংযোগে অংশ নিয়েছেন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আয়োজিত সভাতেও তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন।
দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে। ২০২৫ সালে দুর্গাপূজার আগে উপজেলার বিভিন্ন মন্দির পরিদর্শন করেন তিনি। এর আগে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দলীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতার কথা জানিয়েছিলেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাইকগাছায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আয়োজিত একটি চিকিৎসা ক্যাম্পেও তাঁকে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
ডা. আব্দুল মজিদের জন্ম ১৯৬৪ সালের ৮ মে পাইকগাছা উপজেলার লক্ষ্মীখোলা গ্রামে। তাঁর বাবা মরহুম আনিছ উদ্দীন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও সরকারি চাকরিজীবী।
শৈশব থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন বলে পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৭৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করে ১৯৮৯ সালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর সরকারি চাকরিতে না গিয়ে নিজ এলাকায় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেন আল আমিন ক্লিনিক ও হাসপাতাল। স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ধীরে ধীরে সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হন।
চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগই পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্র তৈরি করে বলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা মনে করেন।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পরও চিকিৎসাসেবা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি ডা. মজিদ। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একজন চিকিৎসক হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের সঙ্গে কাজ করে আসছেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যেও বারবার মানুষের অধিকার, সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং দলের আদর্শের কথা উঠে আসে। ২০২৪ সালের একটি দলীয় সভায় তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আদর্শের কথা উল্লেখ করে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
পাইকগাছা বিএনপির রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও নেতৃত্বের বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বিভিন্ন কমিটি ও সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একাধিক পক্ষের সক্রিয়তার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
২০২৫ সালে উপজেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ডা. মজিদ ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে সভা করেন। একই সময়ে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে উপজেলা সদরে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণেও অংশ নেন।
এতে বোঝা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোকে নতুন করে সক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা ছিল।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ডা. আব্দুল মজিদ বলেন, তিনি শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করেন। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করাই তাঁর লক্ষ্য।
দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ তাঁকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে দলীয় কার্যক্রম ধরে রাখা এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাই তাঁর অন্যতম ভূমিকা।
তবে পাইকগাছা বিএনপির রাজনীতিতে মতপার্থক্য ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখা তাঁর সামনে একটি বড় সাংগঠনিক দায়িত্ব হিসেবে রয়েছে।
ডা. মজিদের রাজনৈতিক বক্তব্যে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতার বিষয়টি উঠে আসে। তিনি নিজেও এসব কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করার কথা বলে থাকেন।
তাঁর অনুসারীদের দাবি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি বিরোধ এড়িয়ে চলতে চান এবং দলীয় রাজনীতির বাইরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির পাশাপাশি সংগঠন পরিচালনার বাস্তব চ্যালেঞ্জও থাকে। পাইকগাছা বিএনপির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
বর্তমানে পাইকগাছা বিএনপির সামনে অন্যতম বিষয় হলো সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। উপজেলা থেকে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত দলীয় কর্মকাণ্ডকে সক্রিয় রাখার কাজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডা. আব্দুল মজিদের রাজনৈতিক যাত্রা তাই শুধু একজন চিকিৎসকের রাজনীতিতে আসার গল্প নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে একটি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ধরে রাখার চেষ্টার সঙ্গেও যুক্ত।
লক্ষ্মীখোলার একজন মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে চিকিৎসক, এরপর সমাজসেবায় সম্পৃক্ততা এবং শেষ পর্যন্ত উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বে আসা এই দীর্ঘ পথ পেরিয়েছেন তিনি।
নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অবস্থানও স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, “আমি শহীদ জিয়ার আদর্শ ধারণ করি। অন্যায়ের কাছে কভু মাথা নত নয়, তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নেই আমার লক্ষ্য।”
এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পাইকগাছা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের একসঙ্গে নিয়ে সংগঠনকে কতটা কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে পারেন তিনি। সেই উত্তর নির্ভর করবে আগামী দিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও মাঠের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকার ওপর।


0 Comments