শিরোনাম

10/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন।

" অধুনা গণতন্ত্রের কফিনে প্রথম পেরেক"

 


 " অধুনা গণতন্ত্রের কফিনে প্রথম পেরেক"

   : রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল :

"ভুলে যাওয়া সহজ,মনে রাখা কঠিন" এটা চিরন্তন সত্য। মানব সমাজে চিরচারিত অংশ এটি। তবুও সামাজিক-গণতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থায় টিকে থাকতে গেলে বা নিজেদের অবস্থান মানব রূপে বহমান রাখার তাগিদে কিছু কথা বা স্মৃতি অবশ্যই আপনাকে বা আমাকে মনে রাখতে হবে। অধুনা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কফিনে কখন? কিভাবে? কারা? প্রথম পেরেক ঠুকে দিলো এটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। শুধু তাই নয় ইতিহাসের পাতায় মীর জাফরকে যেভাবে স্মরণ করা হয় তেমনি করে অধুনা বাংলাদেশের গণতন্ত্র হত্যাকারীদের নামও লিপিবদ্ধ করে রাখা আবশ্যক যাত ভবিষ্যত প্রজন্ম এইসব মানুষগুলোকে চিনতে পারে। সেকারণেই এবিষয়ে লেখার মধ্যে দিয়ে আপনাদের সামনে সামান্য কিছু তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। 
২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল কিন্তু ভোট স্বাধীনভাবে দিলেও এই নির্বাচনের সাথে সাথে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কফিনে প্রথম পেরেক যে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল তা বোধ করি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী কিছু মানুষ বুঝতে পারলেও সাধারণ মানুষ সেদিন বুঝতে পারিনি।
সাধারণ মানুষের বুঝতে বুঝতে এর মাঝে কেটে গেল বহু বছর, ততদিনে গণতন্ত্র নামের প্রাণীটির পাশে মরহুম লেখা হয়ে গেছে। পচে-গলে গন্ধ ছড়ানো শুরু করেছে গণতন্ত্র নামে সেই প্রাণী (অবশ্য ২০২৪ সালের আগষ্ট বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে আবারও পূর্ণজন্ম লাভ করেছে)।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেও নির্বাচনটি মোটেও স্বচ্ছ ছিল না। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন যে, নির্বাচনের মাস দশেক আগেই বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ভারত সফরকালে তার সাথে নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে জেতানোর বিষয়ে সলা-পরামর্শ হয়েছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় গেলে মইন ইউ আহমেদের চাকরি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিল্লির তরফ থেকে দেয়া হয়েছিল। প্রণব মুখার্জি তৎকালীন সময়ে কংগ্রেস সরকারের খুবই প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
আপনাদের হয়তো মনে থাকার কথা দেশদ্রোহী জেনারেল মইন ভারত থেকে কয়েকটি রাজকীয় ঘোড়া উপহার নিয়ে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। দেশের মাটিতে সেদিন পা রাখার পর থেকে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য নানা কলা কৌশল আরম্ভ করেন তিনি। তার সেই রাষ্ট্র বিরোধী অপকর্মে ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন নির্বাচন কমিশন সোৎসাহে মদদ দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচন কমিশনে কমিশনার ছিলেন আমলা ছহুল হোসেন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত সাখাওয়াত।
এখানে একটু উল্লেখ করা দরকার যে, ২০০৮ সালে ওই নির্বাচনে সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা সিটি কলেজ কেন্দ্রে আমি অবস্থান করা অবস্থায় জনাব সাখাওয়াত কেন্দ্রীয় পরিদর্শন করতে আসেন এবং ওই কেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসারকে ডেকে অতি উৎসাহ ভরে আপা কি ভোট দিয়ে গেছেন,কোন অসুবিধা হয়নি তো, আপা খুশি হয়েছেন তো। তখন আমার কৌতূহল হয়েছিল তিনি কোন আপার খুশি দেখতে চাইছেন? কৌতুহল থেকে কিছু সময় পরে কর্মরত অফিসারদের কাছ থেকে জানতে পারলাম তিনি হাসু আপা অর্থাৎ শেখ হাসিনার খুশির কথা জানতে চাইছেন। একজন নির্বাচন কমিশনারের এমন আচরণ দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। অবশ্য সন্ধ্যা নাগাদ বুঝতে পারলাম যে, কেন তিনি হাসু আপার খুশি করার বিষয়ে এত আগ্রহী। তো যাই হোক আরো বিস্মিত হলাম যখন ২০২৪ সালের আগষ্ট বিপ্লবের পর অন্তবর্তী কালীন ডক্টর ইউনুস সরকারের সময় ব্রি জে. (অব) সাখাওয়াত কে প্রথমে স্বরাষ্ট্র পরবর্তীতে বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা পদে দেখতে পেলাম। হায়রে অভাগা জাতি। সহজে ভুলে যাওয়া এই অভাগা জাতির স্মৃতিশক্তি জাগিয়া তোলার জন্য কমিশনের কিছু কর্মকান্ড এখানে উল্লেখ করা খুবই জরুরী মনে করছি। 
কমিশন প্রথমেই বিএনপি ভাঙ্গার কৌশল গ্রহণ করেছিল। ডিজিএফআই এর অতি প্রভাবশালী আমিন-বারি জুটি মান্নান ভূইয়ার নেতৃত্বে এক নতুন বিএনপি করার সর্ব রকম প্রচেষ্টা করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মইনুদ্দিন ও ফখরুদ্দিন সরকারের সাথে নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু হলে কমিশন বেগম খালেদা জিয়া মনোনীত বৈধ মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ারের পরিবর্তে ডিজিএফআই এর তৈরি করা অবৈধ বিএনপি মহাসচিবকে সংলাপে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। 
শামসুল হুদা কমিশন এমনভাবে সংসদীয় সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করে যাতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বিএনপির সমর্থক এলাকা বলে পরিচিত মানিকগঞ্জের সংসদীয় আসন সংখ্যা পূর্বের চারটি থেকে কমিয়ে তিনটি নিয়ে আসে। উল্লেখ্য ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জের চারটি আসনের মধ্য বিএনপি' চারটি আসনের বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। চাতুরতার সাথে এই প্রক্রিয়া দেশের তিনশোটি আসলেই করা হয়। 
নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে জেনারেল মইন ব্রি: জে: সাখাওয়াতের সাথে কক্সবাজার এক গোপন বৈঠক করেন বলে সেই সময় প্রচারিত হয়েছিল। এমন কোন বৈঠক হয়েছিল কিনা, হলে সেখানে কি আলোচনা হয়েছিল সেটা একমাত্র ব্রি: সাখাওয়াত সাহেবই জানেন। বর্তমানের বাংলাদেশে স্বচ্ছতার খাতিরে উনার মুখ খোলা উচিত। 
বিশ্ববাসী ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স নৌকার পক্ষে ভরে রাখার কাহিনী মোটামুটি জানেন। সেই সময়কার জাপানি রাষ্ট্রদূত বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য পরে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। নৌকার পক্ষে বাক্স ভরে রাখার যে কৌশল তা ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরিপূর্ণভাবে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক ড. শামসুল হুদা এবং ব্রি: জে: (অব:) এখন সুশীলদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও তাদের দায় মুক্তি  ঘটার কোন সুযোগ নেই। 
এত গেল শামসুল হুদা কমিশনের নাটকীয় কীর্তিকলাপ। এরপর এলো মিস্টার রাকিব কমিশন। ২০১৪ সালে আর একরকম তেলেসমাতি দেখালো এই কমিশন। নির্বাচনের আগেই ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে কিনা তা আমার অন্তত জানা নেই।  রকিব কমিশনের অধীনে ঘটে যাওয়া তেলেসমাতি কারবারে নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গিয়েছিল। কমিশনের তেলেসমাতিতে বাকশালী কায়দায় শেখ হাসিনা টানা দ্বিতীয়বার বেআইনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান। জাতির সাথে করা এই বীভৎস তামাশায় যারা যুক্ত ছিলেন তাদের নামটি একবার মনে রাখার স্বার্থে জানা দরকার। ১) রকিব উদ্দিন আহমেদ (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) ২) মোহাম্মদ শাহনওয়াজ ৩) ব্রি জে (অব) জাবেদ আলি  ৪) মোহাম্মদ আব্দুল হাফিজ ৫) মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক। 
এরপর ২০১৮ সালে আসে নুরুল হুদা কমিশনের নৈশ ভোটের মহা যাত্রাপালা। আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরা কেরামতি দেখে সারা বিশ্ব হতবাক। নুরুল হুদা কমিশন সম্পর্কে তামাশা করে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক জনাব মাহমুদুর রহমান তার লেখা উপ-সম্পাদকীয়তে বলেছেন, "সিসি-পুতিনরা কেন যে নুরুল হুদাকে বিশেষ সম্মান দিয়ে ইজিপ্ট -রাশিয়ার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিচ্ছে না এটা তিনি ভেবে পান না। 
২০০৮ সালে ড. শামসুল হুদা ও ২০১৮ সালের নুরুল হুদা এক কথায় দুই হুদা বাংলাদেশে হাসিনার ফ্যাসিবাদের শক্তিকে উথানের জন্য বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। নুরুল হুদা পরিষদে কারা ছিলেন আরেকটু মনে রাখা দরকার ১) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী,২) কবিতা খানম, ৩) রফিকুল ইসলাম, ৪) মাহবুব তালুকদার। 
এখানে বিশেষভাবে মাহবুব তালুকদার নামটি সশ্রদ্ধ ভরে উচ্চারণ করা দরকার কেননা তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি এতগুলো জলজ্যান্ত ক্রিমিনালের মাঝে অবস্থান করেও অসীম সাহসের সাথে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। হয়তো তিনি সেদিন সফল হননি, তবুও তিনি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। আজকের এই বাংলাদেশে আমরা যেন তাকে ভুলে না যায়। 
সর্বশেষ ২০২৪ সালে বাকপটু আউয়াল কমিশন জাতিকে নির্বাচন "আমি-ডামি" নির্বাচন দেখিয়েছেন। মঞ্চস্থ করেছিলেন এক নতুন যাত্রাপালার।  মুখোশধারী কুচক্রী হাবিবুল আউয়াল সুন্দর বাক্যর দ্বারা ডা: মরহুম জাফরউল্লাহ চৌধুরীর মত জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিকেও বিভ্রান্ত করে ফেলেছিলেন। ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী হাবিবুল আউয়ালের নিয়োগকে কি আশায় যেন স্বাগত জানিয়েছিলেন তিনি সেটা ভালো জানতেন। আজ তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো এর কারণটি ব্যাখ্যা করতে পারতেন। 
মুখোশধারী কুখ্যাত হাবিবুল আউয়াল এর ডামি নির্বাচনে অন্যান্য কুশীলবরা হলেন: ১) মোহাম্মদ আলমগীর ২) আনিসুর রহমান ৩) আহসান হাবীব খান ৪) রাশিদা সুলতানা। ২০০৮ সাল থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ১৮ জন দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের মধ্যে একমাত্র মরহুম মাহবুব তালুকদার ছাড়া বাকি ১৭ জন শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আমলকে পাকাপোক্তরূপে গড়ে তোলার জন্য প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন। 
এই সময়কালে নির্বাচন কমিশনের সচিবরাও একই অপরাধে অপরাধী। বাংলাদেশের গণতন্ত্র হত্যা করার দায়ে এদের প্রত্যেকের বিচার হওয়া উচিত এবং গণতন্ত্রের কফিনে পেরেক ঠুকে দেওয়ার অপরাধে এদের প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি হওয়া সময়ের দাবি।
শুধু তাই নয় গণতন্ত্র হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা অপরাধের জন্য এসকল অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সকলে মিলে বজ্র কন্ঠে আওয়াজ তোলা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক নয়। 


লেখক:- সাংবাদিক ও কলামিস্ট 
rabidchanchall@yahoo.com

Post a Comment

0 Comments